নৈতিক শিক্ষা কি ? নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব

নৈতিক শিক্ষা কি ? নৈতিক শিক্ষা কাকে বলে ? এর প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব কতটা ? আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা এই বিষয়েই বিস্তারিত আলোচনা করতে চলেছি। 

শিশু বয়স থেকেই প্রত্যেক শিশুকেই কিছু না কিছু নীতি শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। 

এই নীতি-সংক্রান্ত শিক্ষাগুলো প্রতিটি শিশুর মনে ভালো কিংবা মন্দ ব্যাপারগুলো সম্পর্কে ধারণা তৈরী করতে সাহায্য করে। 

যেকোনো শিশুর নৈতিক শিক্ষা শুরু হয় তার বাবা-মায়ের হাত ধরে। 

প্রত্যেক অভিভাবকের তাদের সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা প্রদানের ব্যাপারে খুবই মনোযোগী হওয়া উচিত। 

শৈশবকাল হল সবচেয়ে কমনীয় সময়, যা যেকোনো মানুষের ব্যক্তিত্বের সামগ্রিক বিকাশকে সম্পূর্ণভাবে প্রভাবিত করে। 

একজন অভিভাবক হিসেবে, আপনার শিশুটি কী শিখছে এবং কোথা থেকে শিখছে সে বিষয়ে আপনার মনোযোগী হওয়া দরকারি। 

তেমনিভাবে, একজন অভিভাবক হিসেবে আপনার সন্তানের পারিপার্শ্বিক ও বন্ধুদের সম্পর্কেও সতর্ক থাকতে হবে। 

আর, তাদের ঠিক ও ভুলগুলোকে আপনাকেই শুধরে দিতে হবে। 

সেই কারণেই শিশুদের প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার।

তাই, আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় হল, নৈতিক শিক্ষা কাকে বলে ?

নৈতিক শিক্ষা কি ? (What is moral education)

নৈতিক শিক্ষা কি
About moral education in Bengali.

নৈতিক শিক্ষা বলতে বোঝায় জীবনের ভালো ও সঠিক নীতি অনুসরণের নীতিগত অধ্যয়ন বা পাঠ গ্রহণ করা। 

এই শিক্ষা মূলত কিছু মৌলিক নীতি নিয়ে গঠিত, যেমন – সত্যবাদিতা, ভালোবাসা, সততা, দাতব্য, সহনশীলতা, দয়া-মায়া, আতিথেয়তা, ও সহানুভূতি। 

মোরাল এডুকেশন বা নৈতিক শিক্ষা যেকোনো মানুষকে একটা নিখুঁত চরিত্র গড়ে তুলতে সাহায্য করে। 

শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র ডিগ্রি লাভ করাই নয়, বরং নিজেকে একজন যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

নৈতিক শিক্ষা এমন একটা বিষয় সেটা ঘরে-বাইরে, স্কুল-কলেজে যেখানে খুশি শেখা যায়। 

বাচ্চাদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার আদর্শ জায়গা হল তাদের বাড়ি, কারণ তাদের শৈশবের অনেকটা সময় বাড়িতেই কাটে।

নৈতিক শিক্ষা অনুচ্ছেদ:

নৈতিক শিক্ষা হল মূল্যবোধ, গুণাবলী এবং বিশ্বাসের অধ্যয়ন, যা একজন ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলতে তথা সমাজকে বিকশিত করে তুলতে সাহায্য করে। 

এই শিক্ষার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ গুণাবলীকে গড়ে তোলা হয়। 

যেহেতু, মানুষ সমাজেরই সদস্য; তাই মানুষের মধ্যে গুণাবলী গড়ে তোলার জন্য সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সু-সংস্কৃতি হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

একজন মানুষের জীবনে নৈতিক মূল্যবোধের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। 

মানবজীবনে নৈতিক শিক্ষা অতি দরকারি, তাই মানুষের শিশুকাল থেকেই সেই নীতিগত শিক্ষাগুলো দেওয়া উচিত। 

নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি অপরের অধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজনীয়।

একজন মানুষের জীবনে নৈতিক মূল্যবোধের অনেকখানি গুরুত্ব রয়েছে। 

মানবজীবনে নৈতিক শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই মানুষের শৈশব থেকেই তা শেখানো শুরু করা উচিত। 

আমাদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি অন্যের অধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে।

এই নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে শান্তি, অহিংসা, সহনশীলতা এবং ভ্রাতৃত্বের বার্তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। 

আমাদের চারপাশের প্রকৃতি, জীব-জড় সমস্ত কিছুর প্রতি আমাদের যত্নশীল হয়ে ওঠা উচিত। 

আমাদের পরিবেশে সকল প্রাণীই সমান অধিকার ও ভোগের দাবি রাখে। 

তাই, আমরা নৈতিক শিক্ষা বা নৈতিক মূল্যবোধকে সংজ্ঞায়িত করে থাকি সবার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, কখনো মিথ্যা না বলা, বড়োদের সম্মান করা, সত্যি কথা বলা, ও সবাইকে ভালোবাসা ও সাহায্য করা, এবং অন্যের সাথে খারাপ কাজ না করার মাধ্যমে। 

আর, যখনই সমাজে এই নৈতিক মূল্যবোধের অভাব ঘটে, তখনই মানুষের চরিত্রের অবনতি ঘটে আর এর ফলে সমাজের মধ্যে অপরাধের সংখ্যা বাড়তে থাকে। 

এই কারণেই সুশৃঙ্খল সমাজ তৈরী করতে গেলে নৈতিক শিক্ষা সবারই চারিত্রিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বা নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব:

আমাদের জীবনে নৈতিক শিক্ষার নানান দিক থেকে নানাভাবে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে; তার মধ্যেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নীচে আলোচনা করা হল –

১. মানবিক গুণাবলীর উন্নতি:

নৈতিক শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হল শিশুদের নৈতিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করা; যাতে তারা ভবিষ্যতে একজন যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেদেরকে তৈরী করতে পারে। 

এই নৈতিক শিক্ষার মধ্যে রয়েছে সৌজন্যতাবোধ, গুণাবলীর বিকাশ, নম্রতা, শৃঙ্খলতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহানুভূতি, দয়া, সাহসিকতা, দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও আরও অন্যান্য। 

তাই, মানুষের মানবিক চরিত্র গঠনে নৈতিক শিক্ষা প্রদান একান্তই আবশ্যিক।

২. দেশপ্রেম বোধের সঞ্চার:

কেবলমাত্র নৈতিক শিক্ষাই শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেমের গভীর অনুভূতি তৈরি করতে পারে। 

দেশের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তুলতে গেলে শিশুদের মধ্যে ব্যক্তিগত মূল্যবোধ গড়ে তোলাও কিন্তু দরকারি। 

নৈতিক শিক্ষা দিয়ে আপনার সন্তানদের মধ্যে সবসময় দেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরী করুন।

৩. বিভিন্ন ধর্মের প্রতি সহনশীল থাকা:

নৈতিক শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হল শিশুদের মধ্যে ধর্মীয় সহনশীলতা তৈরী করা। 

বাচ্চাদের বিশ্বাসের মৌলিক উপাদানের সাথে পরিচিত করানোটাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের সময়ে ধর্মীয় সহনশীলতা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়, কারণ এখনকার অস্থির সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের সকলকে ধর্মের ঐক্য ও সমন্বয় সম্পর্কে জানতে হবে। 

এই নৈতিক শিক্ষা পড়ুয়াদের মনে ধর্মীয় সহনশীলতা গড়ে তুলতে পারে। 

তাই, শিশুদের ধর্মীয় উগ্রবাদ থেকে সরিয়ে রাখতে গেলে নৈতিক শিক্ষা খুবই জরুরী।

৪. বিশ্ব ভাতৃত্ববোধ তৈরী করা:

নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলা যেতে পারে। 

যাতে, অন্য জাতির প্রতি তাদের মনে কোনোরকম কোনো বিদ্বেষ বা ক্ষোভ না জন্মায়। 

আর, এই ভাতৃত্ববোধ তখনই গড়ে উঠবে, যখন তারা সঠিক নৈতিক শিক্ষা পাবে।

সমাজে নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয় দৃষ্টিভঙ্গি:

সমাজের অধিকাংশ মানুষ আইন অনুসরণ করে তো চলেই, বরং তারা আরও বেশ কিছু সামাজিক নিয়ম-কানুনও মেনে চলে। 

যেই আইন ও নিয়মকানুনগুলো সাধারণত নৈতিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। 

যদিও, নৈতিকতা ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাই সমাজে বেশ কিছু সাধারণ নৈতিকতা থাকে; যা বেশিরভাগ লোকেরাই মেনে চলে, যেমন –

১. সদা সত্য কথা বলা উচিত 

২. সাহসী হওয়া উচিত 

৩. সম্পত্তির অপচয় বন্ধ করা উচিত

৪. প্রতারণা করা উচিত নয় 

৫. আপনি যেমন ব্যবহার পেতে চান, অন্যদের সাথেও তেমন ব্যবহার করুন

৬. কাউকে অযথা বিচার করা অনুচিত

৭. বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠুন 

৮. আপনার অঙ্গিকার রক্ষা করুন

৯. উদার হন

১০. নম্র হন

১১. ন্যায়বিচার চান 

১২. ভিন্নতার প্রতি সহনশীল হন

১৩. নিজের ও অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন

১৪. বিশ্বস্ত হন

১৫. ধৈর্য ধরতে শিখুন 

১৬. ক্ষমাশীল হন 

১৭. সৎ হন এবং 

১৮. আপনার কর্মের প্রতি দায়বদ্ধ থাকুন

পরিশেষে:

শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈতিক শিক্ষাকে এমনভাবে যোগ করতে হবে যাতে বিভিন্ন কোর্স, ওয়ার্কশপ ও কার্যক্রমে এই নৈতিক মূল্যবোধের বার্তা বিদ্যার্থীদের কাছে আরও সহজ, সরল ও আকর্ষণীয় উপায়ে পৌঁছাতে যেতে পারে। 

এর জন্যে ভালো বই, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, ও অন্যান্য মাধ্যমও ব্যবহার করা যেতে পারে। 

মানুষের জীবনে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, ও মর্যাদা প্রদানের জ্ঞান থাকলে তার ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সমাজ এমনকি দেশের শান্তিও বিরাজমান থাকবে।

বর্তমান সমাজে বিদ্যার্থীদের জন্য নৈতিক শিক্ষা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যা, তাদের মনে মূল্যবোধ স্থাপন করার সাথে সাথে কীভাবে অন্যের সাথে আচরণ করতে হয় তাও শেখাতে সাহায্য করে। 

তাছাড়াও, তাদের নৈতিক শিক্ষার মানে জানা ও বুঝতে পারাটাও কিন্তু ততটাই জরুরি। 

শৈশবের সময়ে নৈতিক শিক্ষা মানুষকে তার সমাজের মূল্যবোধ সম্পর্কে শেখায়। 

এই শিশুকালেই একজন ব্যক্তি ঠিক-ভুল ও তাদের মধ্যেকার পার্থক্য সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে শেখে।

সেই কারণেই নৈতিক শিক্ষার অধ্যায়টি শিশুবেলা থেকেই প্রতিটা মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয়।

আমাদের আজকের মোরাল এডুকেশন / নৈতিক শিক্ষা কি বা কাকে বলে সম্পর্কিত আর্টিকেলটি এখানেই শেষ হল। 

লেখাটি পছন্দ হলে অবশ্যই তা কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন।

এছাড়া, আর্টিকেলের সাথে জড়িত কোনো ধরণের প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকলে, সেটা কমেন্টের মাধ্যমে অবশই জানিয়ে দিবেন।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top
Copy link