নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় – (সেরা ১০ উপায়)

মনকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায়: মনের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে আপনার চিন্তাভাবনা ও আবেগগুলো কিন্তু এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। 

মনকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায়
মনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে কি করতে হবে ?

আপনি নিজের মনে অনেক হাবিজাবি বিষয় নিয়েও অযথা চিন্তা করতে পারেন, নিজের ব্যাপারে অহেতুক সন্দেহ করতে পারেন কিংবা আপনার আবেগগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থও হতে পারেন। 

যা কিন্তু, আপনার স্বাভাবিক জীবনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। 

তাই, সেক্ষেত্রে আপনি আপনার মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন; এমনকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আপনার নেতিবাচক চিন্তাগুলোকেও ইতিবাচক চিন্তায় পরিণত করতে পারেন। 

এর মাধ্যমে আপনি সময়ের সাথে সাথে নিজেকে আরও সুখী ও সম্পূর্ণ বোধ করাতে পারবেন এবং আপনার অনুভূতিগুলোকেও যথেষ্ট ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

তাই, আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করবো, মনকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে সেই বিষয় নিয়ে।

এখান থেকে আপনারা জানতে পারবেন, নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করার সেরা কতগুলো উপায় সম্পর্কে; যা আপনাকে সুন্দর জীবনযাত্রার পথে চালিত করতে সহায়তা করবে।

নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায়:

মনকে নিয়ন্ত্রণ করার সেরা ১০টি উপায় নিচে একে একে বলে দেওয়া হলো।

১. যে মানসিক পরিবর্তন করতে চান, তা চিহ্নিত করুন:

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আপনি যে সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান সেটা আগে চিহ্নিত করাটা জরুরি। 

অনেকেই নিরুৎসাহিত চিন্তাভাবনা কিংবা মানসিক বিপত্তির শিকার হন। 

আপনি যদি বর্তমানে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হন, তাহলে তা আপনার চিন্তাভাবনা ও মানসিকতার উপর কুপ্রভাব ফেলতে পারে। 

এমনকি, এদিক-ওদিকের চিন্তাগুলোও বিরক্তিকর হয়। 

আর, এই চিন্তাগুলো প্রায়শই আপনার জীবনযাত্রাকে বিঘ্নিত করতে পারে। 

এছাড়াও, যেসব চিন্তা আপনার মানসিক জীবনকে ব্যহত করতে হতে পারে, সেগুলো হল –

  • একটা স্থির হতাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
  • নিজের ব্যাপারে নেতিবাচক কথা
  • গুজব বা বারবার ফিরে আসা চিন্তা
  • কংগ্নিটিভ বায়াস, চিন্তাভাবনার ত্রুটি – যা আপনার পছন্দ বা কথোপকথনকে প্রভাবিত করতে পারে।

২. অবাঞ্ছিত চিন্তাগুলোকে মেনে নিন:

কষ্টকে এড়ানো মানুষের স্বাভাবিক স্বভাব। 

তাই, আমরা অবশ্যই এমন চিন্তা এড়াতে পছন্দ করি, যা আপনার কষ্টের কারণ হয়। 

তা সত্ত্বেও, আমরা অবাঞ্ছিত চিন্তাভাবনাগুলোকে দূরে ঠেলেও অনেক সময়েই তা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা। 

বরং, এই চিন্তাগুলো আমাদেরকে পেয়ে বসে। 

তাই, চিন্তাগুলোকে এড়ানোর পরিবর্তে সেগুলোকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন। 

আপনি মেনে নিন যে, বহু পরিশ্রমের বিনিময়েও আপনি জীবন থেকে যা চাইছেন, সেটা পাচ্ছেন না এবং তার জন্যে আপনি খারাপও বোধ করছেন। 

নিজেকে পরিবর্তন করার জন্য আপনি অনেক কিছুই করতে পারেন, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে হাল ছেড়ে দেওয়ার কোনো কথাই হয় না। 

গ্রহণযোগ্যতা অনেক সময়েই আপনার চিন্তার সমাধান এনে দিতে পারে। 

তাই, নিজের পরিস্থিতির সাথে নিজের মনকে মানিয়ে নিতে শিখুন।

৩. ফোকাস পাল্টান:

আমাদের আবেগ ও চিন্তাভাবনা সবসময় ইতিবাচক হয় না- আর, এটাই হল আমাদের বাস্তব জীবন। 

কিন্তু, একবার আপনি যদি এই চিন্তা ও আবেগগুলোকে চিনতে ও মেনে নিতে পারেন, তাহলে আপনিও নেতিবাচকতা থেকে সরে আসতে পারেন। 

ইতিবাচক চিন্তাভাবনাগুলো আমাদের চাপ ও হতাশাকে কমাতে সাহায্য করে। 

ইতিবাচক দিকে মনোনিবেশ করার মাধ্যমে আপনি সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করতে পারেন। 

এর মাধ্যমে আপনি খারাপের চেয়ে ভালো দিকে ফোকাস করতে পারেন ও প্রতিদিনের কৃতজ্ঞতা অনুশীলন করতে পারেন। 

আর, আপনি যখন প্রাচুর্যের মধ্যে থাকেন, তখন নেতিবাচক চিন্তার কোন স্থানই থাকে না।

৪. মুহূর্ততে বাঁচুন:

আপনি যেকোনো পরিস্থিতিতে আত্মসচেতনতা বজায় রাখতে পারদর্শী হয়ে উঠলে, আপনি আপনার চিন্তাভাবনা ও আবেগগুলো বুঝতে শুরু করবেন। 

আর, বুঝতে থাকার পাশাপাশি তা আপনার প্রতিটা কাজের ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। 

অনেক সময়েই আপনার নেতিবাচক আবেগগুলো আপনার চিন্তাভাবনাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দাঁড়াতে পারে। 

তখন, আপনি আপনার নিজের মনকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন, আপনার আবেগ কি বলছে এবং এটার থেকেই শিখুন। 

জীবনযাপনের ধারার ক্ষেত্রে উদাসীন মনোভাব ত্যাগ করে আপনি সুখের কামনা করার বদলে, বর্তমান সময়ে আপনার অস্তিত্বকে স্বীকার করে জীবনকে ঠিক পথে চালাতে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুন।

৫. মেডিটেশন করুন:

মনকে নিয়ন্ত্রণ করার সবথেকে সেরা উপায় হল মেডিটেশন বা ধ্যান করা। 

ধ্যান করার মাধ্যমে আপনি আপনার মনকে কেন্দ্রীভূত করে শান্ত করে তুলতে পারেন। 

মেডিটেশনের প্রথম সূত্রই হল প্রতি মুহূর্তে মাত্র একটা করে সমস্যার প্রতিই মনোযোগী হওয়া। 

ধ্যান করার সময়ে আমরা যেকোনো একটা দিকেই মন দিই, যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ কিংবা বিশেষ কোনো মন্ত্র উচ্চারণ করি, যেমন’ ওম’। 

মেডিটেশন করার সময় মনোযোগ নষ্ট হলে, নিজেকে দোষ না দিয়ে, আবার শুরু করুন। 

ধ্যানে মনোযোগ বাড়ানোর জন্যে প্রতিদিনের প্র্যাক্টিস থাকাটা দরকারি।

৬. লিখে ফেলুন:

নিজের চিন্তাগুলোকে বন্দি করে মনকে হালকা করার একমাত্র রাস্তা হল সেগুলোকে লিখে ফেলা। 

লেখার ফলে, আপনার মন শান্তভাবে যেকোনো একটা করে সমস্যার উপরই কেন্দ্রীভূত হয়।

তাই, আপনি ধীরে-সুস্থে ও শান্তভাবে লেখার মাধ্যমে আপনার চিন্তাগুলোকে ডায়েরি বন্দি করতে পারবেন। 

এমনকি, লেখার মাধ্যমে আপনি আপনার জটিল আবেগগুলোকেও সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারবেন। 

লেখার আগে ১৫ মিনিট ধ্যান করে নিলে, আপনি আরও পরিষ্কারভাবে আপনার ভাবনাগুলো ব্যক্ত করতে পারবেন। 

আপনি আপনার ডায়েরিতে খোলামেলাভাবে ইতিবাচক, নেতিবাচক সমস্ত চিন্তাভাবনাই প্রকাশ করতে পারেন।  

৭. স্ট্রেস ম্যানেজ করার চেষ্টা করুন:

যখন পরিস্থিতি আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে আপনার জীবনে চাপ বাড়ায়, তখন আপনার মনের অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা কিন্তু বেশ কঠিন হয়ে উঠতেই পারে। 

স্ট্রেস ও উদ্বেগ অবাঞ্ছিত চিন্তার জন্ম দেয়। 

তাই, আপনার জীবনের স্ট্রেসের উৎসগুলো বের করে, সেগুলোকে কমানোর সম্ভাব্য উপায়গুলো খুঁজে বের করুন। 

বেশিরভাগ লোকেরা স্ট্রেসের উৎসগুলোকে সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করতে পারে না। 

স্ট্রেস প্রায়ই বাইরের উৎস থেকেই আসে। 

আপনি আপনার চারপাশে ঘটা ব্যাপারগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেনই না। 

সেক্ষেত্রে, নিজের যত্ন নেওয়াই হল একমাত্র উপায়। 

আপনার মন ও শরীরকে সময় ও যত্ন দেওয়ার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে সুস্থ করে তুলতে পারেন৷ 

যার মাধ্যমে আপনি আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে জীবনের অসুবিধাগুলোকে দূর করতে পারবেন।

আপনার সেলফ-কেয়ার রুটিনের মধ্যে পড়তে পারে –

  • পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ
  • মানসম্পন্ন লম্বা ঘুম
  • প্রয়োজনীয় শরীর চর্চা
  • সুস্থ সামাজিক সংযোগ
  • প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়া
  • বিশ্রামের জন্য সময় বের করা

৮. মনোযোগ বন্টন করার চেষ্টা করুন:

কিছু পরিস্থিতিতে আমরা এমনভাবে হতাশা বোধ করি,

তখন আমরা চাই আমাদের খারাপ চিন্তাভাবনাগুলো থেকে বেরিয়ে এসে, অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে। 

সেই ক্ষেত্রে, আপনার মনযোগকে যদি বিভিন্ন কাজে বন্টন করে দেন, তাহলে তখন আপনি আপনার চিন্তাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন। 

ধরুন, খুব বৃষ্টির জন্যে আপনার শপিং যাওয়ার প্ল্যান ক্যানসেল হল, এতে আপনার খুব মন খারাপ হল। 

তখন আপনি টিভি দেখে, গল্প পড়ে কিংবা রান্না করেও মনকে ডাইভার্ট করতে পারেন। 

এছাড়াও, আপনি যেসব ইতিবাচক কাজে নিজেকে ইনভল্ভ করতে পারেন:

  • ওয়াকে যাওয়া
  • গাছে জল দেওয়া
  • পছন্দের খাবার খাওয়া
  • শান্ত বা মুড-লিফটিং গান শোনা
  • প্রিয় মানুষের সাথে সময় কাটানো

৯. গাইডেড ইমেজারি মেডিটেশনের চেষ্টা করুন:

গাইডেড ইমেজারি হল ধ্যানের একটি কৌশল, যেখানে আপনি শান্ত মানসিক অবস্থার মধ্যে কোনো ইতিবাচক ও শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতির কল্পনা করেন। 

এই চিত্রগুলো আপনাকে ইতিবাচক মেজাজ তৈরী করে চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করতে পারে। 

আপনি নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে এই মেডিটেশন শুরু করতে পারেন –

  • কোমর টানটান করে বসে চোখ বন্ধ করুন।
  • কয়েকবার গভীর শ্বাস নিন।
  • এরপর আপনি আপনার চাক্ষুষ দৃশ্য তৈরির সাথে সাথে শ্বাস নিন।
  • প্রচুর সংবেদনশীল বিবরণ ব্যবহার করে আপনার মনে একটা শিথিল দৃশ্য তৈরি করুন।
  • এমন কিছু ভাবুন, যা আপনার মনকে শান্তি এনে দেয়- সেটা আপনার ছোটবেলার খেলার দৃশ্য হতে পারে, আপনার প্রিয় বাগানের ফুল হতে পারে কিংবা কোনো সমুদ্রের ধার।
  • আপনার ত্বকের উপর বাতাসের স্পর্শ, শব্দ, ও গন্ধের অনুভূতিগুলো যুক্ত করেই দৃশ্য কল্পনা করার চেষ্টা করুন।
  • আপনি যে দৃশ্যটি তৈরি করেছেন তার মধ্যে দিয়ে ঘুরে বেড়ান, আপনার চারপাশকে মনযোগ সহকারে লক্ষ্য করুন ও প্রতিটি বিশদ বিবরণ দেখার চেষ্টা করুন।
  • ধীরে ধীরে শ্বাস নিয়ে যান, দৃশ্যের শান্তিময়তাকে নিজের মনে জায়গা করে দিন ও মনকে হালকা করুন।
  • এই দৃশ্য উপভোগ করতে ১০-১৫ মিনিট সময় নিন।
  • কয়েকবার গভীর শ্বাস নিয়ে মেডিটেশন শেষ করে আস্তে-আস্তে আপনার চোখ খুলুন।

১০. থেরাপিস্টের সাথে কনসাল্ট করুন:

নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলা যতটা সহজ, অনেক সময়েই করা ততটা সোজা নাও হতে পারে। 

উপরের উপায়গুলো ক্রমাগত মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ও লক্ষণগুলোর ক্ষেত্রে খুব বেশি পার্থক্য নাও আনতে পারে, যথা-

  • হতাশা
  • উদ্বেগ
  • দীর্ঘস্থায়ী হতাশা ও দুঃখ
  • অবসেশানস ও কম্পালশন্স
  • অন্যদের উপর অতিরিক্ত সন্দেহ ও নেতিবাচক চিন্তা করা
  • অপ্রয়োজনীয় চিন্তা, যা বারবার ফিরে আসে ও তীব্রভাবে অনুভূত হয়

আপনার সম্পর্ক ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্যে উপরে উল্লেখিত যেকোনো মানসিকতা অসুস্থতার জন্য পেশাদার সহায়তা খোঁজাটা যথেষ্ট জরুরি। 

একজন থেরাপিস্ট আপনাকে আপনার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো সনাক্ত করতে ও সম্ভাব্য সমাধান বের করতে সাহায্য করতে পারেন। 

থেরাপি আত্ম-সহানুভূতিকে বাড়াতে ও ইতিবাচক স্ব-কথোপকথন অনুশীলন করতে উৎসাহী করে তোলে। 

যা আপনার মানসিকতার উপর নিয়ন্ত্রণ ও পুনরুদ্ধারের জন্য বিশেষভাবে সহায়তা করে। 

এমন একজন থেরাপিস্ট খুঁজুন, যিনি আপনাকে নিম্নলিখতি থেরাপিগুলো দিতে পারেন –

  • সাইকোডাইনামিক থেরাপি
  • কংগ্নিটিভ বিহেভোরিয়াল থেরাপি
  • একসেপ্টেন্স এন্ড কমিটমেন্ট থেরাপি
  • মাইন্ডফুলনেস-বেসড কংগ্নিটিভ থেরাপি

এই থেরাপিগুলো মূলত আমাদের ভুলভাল চিন্তাগুলোকে দূর করে আমাদেরকে একটা সুস্থ জীবন দেওয়া ডিজাইন করা হয়েছে।

আমাদের আজকের নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় নিয়ে লেখা আর্টিকেলটি এখানেই শেষ হল।

লেখাটি পছন্দ হলে অবশ্যই তা কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top
Copy link