সমালোচনা কি ? অন্যের সমালোচনা করা ভালো না খারাপ

সমালোচনা কাকে বলে: আজকের আমাদের আর্টিকেলের বিষয়টি কিছুটা আলাদা। কেননা আজকে আমরা সমালোচনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে চলেছি। আমরা এই আর্টিকেলের মাধ্যমে জানবো, সমালোচনা কি”, বা “সমালোচনা বলতে কি বুঝায়”, এবং “সমালোচনা জয় করার ৫ টি উপায়” নিয়ে। 

সমালোচনা কাকে বলে
What is criticism in Bengali ?

সমালোচনা কি ?

সমালোচনা শব্দটি  সম্যক এবং আলোচনা দুটি শব্দের সংযোগে তৈরি হয়। সম্যক শব্দটির অর্থ সর্বপ্রকার বা সমগ্র রূপে।

আলোচনা শব্দটির সাধারন অর্থ হল নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কথাবার্তা। 

তাহলে সমালোচনা শব্দটির যে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে তা হল, কোনও নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে সম্পূর্ণ রূপে আলোচনা।

বর্তমান যুগে যে কোনো বিষয়েই সমালোচনা হয়ে থাকে, সাহিত্য, সংগীত, টেলিভিশন থেকে রাজনীতি, কেউ সমালোচনা করছেন, কেউ সমালোচিত হচ্ছেন।

চলুন, সমালোচা মানে কি বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিত ভাবে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করা যাক।

সমালোচনা কাকে বলে ?

সমালোচনার প্রকৃত সংজ্ঞাটি হল,

“কোনো বিষয় বা কাজের উৎকর্ষ বা অপকর্ষ নির্ণয়ের জন্য যে বিচারমূলক পদ্ধতিতে তার ভাব, বস্তু, রীতি, প্রভৃতি বিষয় আলোচনার মাধ্যমে প্রকাশ পায় তাকেই সমালোচনা বলে।”

সমালোচনার প্রকারভেদ গুলো 

চলুন এবার আমরা জেনেনেই সমালোচার আলাদা আলাদা প্রকার গুলোর বিষয়ে।

১) আত্ম সমালোচনা

আত্মসমালোচনা হল উৎকৃষ্ট সমালোচনা।

এক্ষেত্রে নিজের কাজের সমালোচনা নিজে থেকেই করা হয়, ফলে কোনো কাজে ভুল হয়ে থাকলে তা সহজে ঠিক করে নেওয়া সম্ভব।

এবং আত্মসমালোচনার ফলে অনুতাপের সৃষ্টি হয়ে আর যার ফলে পরবর্তী জীবনে মানুষ সেই ভুল গুলো এড়িয়ে চলে। 

২) ব্যক্তিগত সমালোচনা

ব্যক্তিগত সমালোচনা অত্যন্ত নিম্নমানের সমালোচনা।

কিছু ব্যক্তি অন্যকে ছোটো করে নিজের কৃতিত্ব বৃদ্ধির জন্য এই গুলি করে থাকেন।

এতে অপর মানুষের বিভিন্ন ভুল ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করে তাকে ঠাট্টা তামাশা করা হয়।

এগুলি অসুস্থ মানসিকতার লক্ষণ। 

৩) সাহিত্য সমালোচনা

সাহিত্য সমালোচনা একটি বিশেষ সমালোচনা। এইক্ষেত্রে কোনো লেখকের সাহিত্যের উৎকর্ষ বা অপকর্ষ নির্ণয়, তার ভাব, বস্তু, রীতি, অলংকার ও স্রষ্টার বিশিষ্ট মানস দৃষ্টি প্রভৃতি বিষয়  আলোচনা করা হয়।

বর্তমানে অনেক পত্র পত্রিকাতে সাহিত্য সমালোচনা এবং পুস্তক সমালোচনা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।

ধরা যাক কোনো একটি লেখকের একটি বই প্রকাশ পেয়েছে। বইটির বিষয়, লেখার ধরন, শব্দ চয়ন এবং ভাষায় শব্দের ব্যবহার, বইয়ের পৃষ্ঠা, পাতার মান, বাঁধাই, প্রচ্ছদ এই বিষয়ে সমালোচনা করা হয়ে থাকে।

বইটি আদতে পাঠককে কতটা উৎসাহিত এবং আনন্দিত করবে, বইটি আদতে ক্রয়যোগ্য কিনা তা এই সমালোচনার মাধ্যমে বিচার করা হয়।

বহু নামী দামী লেখক, লেখিকা, সম্পাদক, গবেষক সাহিত্য সমালোচনা করে থাকেন।

সাপ্তাহিক বর্তমান, বইয়ের দেশ, আরো বিভিন্ন পত্রিকাতে সাহিত্য সমালোচনা চোখে পড়ে।

এছাড়াও বর্তমানে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতেও সাহিত্য সমালোচনা এবং পুস্তক সমালোচনা হয়ে থাকে। 

৪) ফিল্ম ও সংগীতের সমালোচনা

ফিল্ম এবং সংগীত সমালোচনাও অনেকটা সাহিত্য সমালোচনার মতো। একটি ফিল্মের পরিচালনা, চরিত্র, কথোপকথন, সংলাপ, অভিনয়, ব্যাকগ্রাউন্ড, অ্যাকশন, গান এই সব বিষয়ে সমালোচনা হয়ে থাকে।

দৃশ্য, গানের সুর , অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয়, সংলাপ এই বিষয়গুলি কতটা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা আলোচনা করা হয়। 

৫) খেলার সমালোচনা

বিভিন্ন খেলার সময় বিশেষ করে ক্রিকেট খেলার সময় কমেন্ট্রি বক্সে, টিভির পর্দায়, বেতারে  এবং বিভিন্ন দৈনিক পত্রে খেলার সমালোচনা হয়ে থাকে।

বলার কত স্পীডে বল করলেন, বলটি লোপিচ না হাইপিচ, কোন দল জিতল, অপর দল কেন হারলো এইসব সব সম্পর্কিত আলোচনা প্রায়শই হয়ে থাকে।

৬) রাজনৈতিক সমালোচনা

রাজনৈতিক সমালোচনা বিভিন্ন খবরের চ্যানেলে টিভির পর্দায় দেখা যায়। সরকারের কোনো প্রকল্প, বিরোধীদের দাবি এইসব বিষয়ে আলোচনা হয়ে থাকে। 

৭) বৈজ্ঞানিক সমালোচনা

বৈজ্ঞানিক সমালোচনা বিভিন্ন গবেষণা ধর্মী পত্রিকাতে হয়ে থাকে।

বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্ত, কোনটি সমাজে এবং মানবকল্যানে কতটা উপযোগী, আবিষ্কারটির ত্রুটি, সফলতা ইত্যাদি নিয়ে সমালোচনা হয়ে থাকে।

সমালোচনার  বৈশিষ্ট

একটি সমালোচনা কতটা উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট তা বোঝা যায় সমালোচনার পদ্ধতি থেকে।

আলোচনা টি কি ব্যক্তিগত আক্রমণ, পরনিন্দা নাকি সত্যি সমালোচনা  তা বোঝা যায়, সমালোচনাটির বৈশিষ্ট্য দেখে।

একটি আদর্শ সমালোচনার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল,,

১) কোনো সমালোচনা অপর কাউকে অপমান , কাউকে ছোটো দেখানো, পরনিন্দা, অপরের  মানহানি করার উদ্দেশ্যে করা হয় না। 

২) সমালোচনাটিকে  যথাসম্ভব নিরপেক্ষ, পক্ষপাতহীন, বস্তুনিষ্ট এবং দিক নির্দেশক হতে হবে। 

৩) সমালোচনা সেই বিষয়ে  অভিজ্ঞ, জ্ঞানী,পন্ডিত এবং সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কোনো ব্যক্তি দ্বারা করা হয়।

৪) কোনো সমালোচনায়, বিষয়টির ভালমন্দ বিচার, বিভিন্ন দিকের যুক্তিসঙ্গত আলোচনা, ক্রুটিবিচ্যুতি এবং সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করা হয়ে থাকে।   

অন্যের সমালোচনা করা ভালো না খারাপ ?

 সব বিষয়ের ভালো খারাপ দুটি দিক হয়। সমালোচনার ও ভালো আছে খারাপ ও আছে।

মানুষকে জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সমালোচিত হতেই হয়।

তবে আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন সবার সমালোচনা করার অধিকার নেই, যে সাহায্য করতে পারেনা তার সমালোচনা করারও কোনো অধিকার নেই।

এখন দেখে নেওয়া যাক সমালোচনার ভালো দিক গুলি। 

১) সমালোচনা মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি করে। সমালোচনা পূর্ববর্তী কাজের ভুল গুলির পুনরাবৃত্ত ঘটায় না। সমালোচনা মানুষকে উন্নত করে।

উদাহরন হিসাবে বলা যেতে পারে, কোনো লেখক যিনি প্রচুর লিখেছেন কিন্তু কেউ তার লেখা পড়েনি তাই তিনি সমালোচিত হননি।

যে ভুল তিনি আগেও লেখার সময় করেছেন এখনো সেই ভুল হয়ে যাচ্ছে, কারন কেউ তার ভুল গুলি তাকে জানাননি।

কিন্তু কেউ যদি তার লেখা পড়ত, সমালোচনা করত তাহলে তিনি নিজের ভুল গুলি সম্পর্কে অবগত হতে পারতেন।

ভ্যান গগের ছবি তাঁর ছবি জীবিত কালে সমাদৃত হয়নি।

ওনার মৃত্যুর পর ওনার ছবির সমালোচনা হয়, তখন মানুষ উপলব্ধি করেন ভ্যান গগ কত উচ্চ মানের শিল্পী ছিলেন। 

২) সমালোচনা বাকিদের থেকে সমালোচিত ব্যক্তিকে এগিয়ে রাখে। সমালোচনার ফলে সমালোচিত ব্যক্তি নিজের দোষ, ত্রুটির পুনরাবৃত্ত ঘটান না।

ফলে কাজটি যথাসম্ভব নিপুন এবং সুন্দর হয়। যা তাকে বাকিদের থেকে অনেকাংশে এগিয়ে রাখে।

তবে সমালোচনার খারাপ দিক কিছু আছে, যেগুলি উল্লেখ করা প্রয়োজন। 

১) কোনো ব্যক্তি বারবার সমালোচিত হতে হতে অনেক সময় মনোবল হারিয়ে ফেলেন। ফলে কাজে উৎসাহ কমে যায় এবং ব্যর্থতা বেড়ে যায়। 

২) সমালোচনার নামে অনেকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে থাকে। এই গুলি বেদনাদায়ক। এই জাতীয় সমালোচনা সমালোচিত ব্যক্তিটিকে অপমানিত করে।

সমালোচনা গ্রহন করার ক্ষমতা । সমালোচনা জয় করার ৩ টি উপায়

মানুষ সমালোচনা করবেই তবে প্রত্যেকেই সমালোচনা গ্রহন করার ক্ষমতা রাখতে হবে। নইলে তা মনকে আঘাত করবে।

রাজহাঁস যেমন দুধে জলে মিশে থাকলে দুধ টুকু খেয়ে নেয়, জল টা পড়ে থাকে, তেমনি সমালোচনা থেকে যে বিষয় গুলি নিজের উন্নতির জন্য প্রয়োজন সেগুলি গ্রহন করতে হবে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমালোচনার ভালো বিষয় গুলি মানুষ নিতে পারেনা তবে ভুল গুলি তার কাছে বোঝা হয়ে যায়।

তাই সমালোচনা গ্রহন করার ক্ষমতা চাই যা সমালোচনার ইতিবাচক দিকগুলি গ্রহনে সাহায্য করবে। 

ক) সমালোচনার ভাষা

যিনি সমালোচক তিনি সবক্ষেত্রে যে ভালো ভাষায় সমালোচনা করবেন তা নয়। হয়তো খারাপ বা কড়া  ভাষাতেই সমালোচনা করলেন।

তবে সেক্ষেত্রে সমালোচিত ব্যক্তিকে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে রেগে গিয়ে রূঢ় আচরণ করা অনুচিত।

সমালোচকের ভাষার দিকে খেয়াল না রেখে তিনি কি বলছেন সেইটির দিকে নজর রাখতে হবে।

সমালোচনার সারমর্মটি বুঝে নিতে হবে। 

দুই পক্ষই যদি সমালোচনাকে দ্বন্দ হিসাবে ভাবে  তাহলে তা অত্যন্ত ক্ষতিকর।

তাই সমালোচিত ব্যক্তির সমালোচনা থেকে নিজের ভুল গুলির এবং ইতিবাচক দিকগুলির দিকেই লক্ষ্য রাখা উচিত।

খ) সমালোচনাকে ব্যক্তিগত না ভাবা

যদি কেউ কাজের সমালোচনা করছে এর অর্থ এই নয় যে সমালোচক, সমালোচিত মানুষটিকে ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ করেন না বা ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ হয়নি বলে সমালোচনা করলেন। 

কোনো একটি কাজ কে কোন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করবে তা বলা কঠিন।

তাই কোনো কাজ ১০০% ঠিক তা বলা যায় না। কারোর কাজের সমালোচনা করার অর্থ এই নয় সেই ব্যক্তিটির সমালোচনা করা হচ্ছে।

তাই সমালোচকের প্রতি আক্রমণাত্মক না হয়ে সহনশীল হয়ে উঠতে হবে।

সবার কাজ সবাই ভালোবাসবে এমনটা নয় বা সবাইকে একসঙ্গে সন্তুষ্ট করা যাবে তাও না। 

তাই, কোনো সমালোচিত ব্যক্তি ভাবেন যে, তার কাজ ভালো হয়েছে এবং তারপরেও কেউ তাকে সমালোচনা করেছে  তাহলে শান্ত হয়ে শুনুন।

ভাবুন এবং ভবিষ্যতে নিজের কাজ আরো ভালো করার চেষ্টা করুন।

সমালোচনাকে ব্যক্তিগত ভাবে না নিয়ে পেশাদারিত্বের সাথে নেওয়াই আসল ব্যাপার।

গ) মানুষের কাছে সমালোচনা চেয়ে নেওয়া

অনেকেই আছেন যারা নিজের  সমালোচনা পেতে বা শুনতে পছন্দ করেন না।

কিন্তু সমালোচনা না থাকলে কারো ভালো বা খারাপ কিছু জানা যাবে কীভাবে? তাই মানুষের কাছ থেকে সমালোচনা চেয়ে নিতে হবে। 

আর সেটা আসবে মতামত হিসেবে।

কিন্তু সেখান থেকে নেতিবাচক দিকগুলো আলাদা করে নিতে হবে এবং সেই দিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ রাখতে হবে যাতে পরবর্তীতে আর ভুল না হয়।

ধরা যাক – একটি বইয়ের কোনো একটি মুদ্রনে যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য বানান ভুল হয়েছে, লেখকের অজ্ঞতার জন্য কিছু তথ্য ভুল ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, বইটিতে তথ্যসূত্র নেই এই তথ্যগুলির ওপর একজন পাঠক সমালোচনা প্রকাশ করেছেন।

এই ভুল গুলি লেখক কে সচেতন করে দিল।

যখন বইয়ের পরবর্তী সংস্করন প্রকাশ হল দেখা গেল বইটিতে আগের ত্রুটি গুলি নেই বরং বইটি আরো নিখুঁত এবং উৎকৃষ্ট হয়েছে। 

সমালোচনা জীবনের প্রতিপদে প্রয়োজন যা আমাদের ভুল গুলি পুনরাবৃত্ত করতে বাধা দেবে আমাদের সচেতন করবে এবং একজন সফল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করবে।

তাই ব্যক্তিগত সমালোচনা কে অপমান বা আঘাত হিসাবে না নিয়ে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে হবে।

আমাদের শেষ কথা,,

তাহলে বন্ধুরা, আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা সমালোচনা কাকে বলে বা সমালোচনা কি, এর প্রকার এবং কিভাবে সমালোচনা জয় করতে হয়, এই প্রত্যেক বিষয়ে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করলাম।

তাই, যদি সমালোচনার বিষয়ে লিখা আমাদের আজকের আর্টিকেল আপনাদের ভালো লেগে থাকে, তাহলে অবশই আর্টিকেলটি সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করবেন।

এছাড়া, আর্টিকেলের সাথে জড়িত কোনো ধরণের প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকলে, নিচে কমেন্ট করে অবশই জানাবেন।

অবশই পড়ুন –

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error:
Scroll to Top
Copy link