নৈতিক বিকাশ কাকে বলে – What Is Moral Development in Bengali ?

নৈতিক বিকাশ কি বা নৈতিক বিকাশ কাকে বলে – What Is Moral Development in Bengali ? আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা এই বিষয়েই বিস্তারিত আলোচনা করতে চলেছি।

আমাদের ছোট থেকে বড় হওয়ার পথে ছোট-বড় নানা ধরণের বিষয়গুলো অনুশীলন ও চর্চার মাধ্যমেই আমাদের শিক্ষা প্রদান করা হয়। 

তারই মধ্যে একটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল মোরাল ডেভেলপনেন্ট বা নৈতিক বিকাশ

আমাদের আজকের এই আর্টিকেল থেকে আমরা জানবো, এই নৈতিক বিকাশ কি ? ও এর প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব সম্পর্কে

আসুন, তাহলে জেনে নেওয়া যাক, নৈতিক বিকাশ কাকে বলে?

Post Contents

নৈতিক বিকাশ বলতে কি বুঝ ?

নৈতিক বিকাশ কাকে বলে
নৈতিক বিকাশ বলতে কি বুঝ ?

আসলে নৈতিক বিকাশ হল এক ধরণের প্রক্রিয়া, যেই প্রক্রিয়ার সাহায্যে শিশুদের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার, নিয়ম এবং আইনের ভিত্তিতে সমাজের অন্যান্য মানুষের প্রতি সঠিক মনোভাব ও আচরণ গড়ে তোলা হয়।

সবিস্তারে বলতে গেলে, নৈতিক বিকাশ হল সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ঠিক ও ভুল, সঠিক এবং অনুচিত বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রগতিশীল ধারণা তৈরি করা হয়। 

নৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে, নৈতিকতা বলতে বোঝায়, ন্যায়বিচার, অন্যের কল্যাণ এবং অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মানুষের একে অপরের সাথে কীভাবে আচরণ করা উচিত, সেই সম্বন্ধের নীতিগত শিক্ষা প্রদান।

নৈতিকতা অর্জন করার জন্যে সামাজিক আচরণ, আবেগ, বিশ্বাস এবং উদ্দেশ্যমূলকতার ভূমিকাও একান্ত জরুরি। 

যার সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায়, যে কীভাবে নৈতিকতার মাধ্যমে মানুষের মনের সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটানো সম্ভব। 

আর, এই নৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রটি অনেকটাই বিস্তৃত। 

যেখানে এই নৈতিক বিকাশ নির্ভর করে থাকে মানুষের সহকর্মী, কর্তৃপক্ষের ব্যক্তিত্ব এবং সমাজের সংস্কৃতির ভূমিকার উপর। 

স্ব-নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া যেমন- মানুষের নিজের বিবেক, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, সহানুভূতি ও পরের জন্যে করা শুভ চিন্তাও কিন্তু এই মোরাল ডেভেলপমেন্টেরই অঙ্গ। 

এই বিকাশের উপর নির্ভর করে থাকে সম্পদ বরাদ্দকরণ, সামাজিক বর্জন, নৈতিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও তুলনামূলক পদ্ধতি আর ইতিবাচক যুব উন্নয়ন ও সাধারণ নাগরিক প্রবৃত্তি।

নৈতিক বিকাশ প্রতিটি বাবা-মায়ের জন্য চিন্তার একটা বিষয়। 

একটি শিশুকে ঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখানো এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করতে শেখানো, যেকোনো পিতামাতারই একটা প্রধান লক্ষ্য থাকে।

নৈতিক বিকাশ হল এক ধরণের জটিল বিষয় যা মানব সভ্যতার শুরু থেকেই রয়েছে। 

পরবর্তীতে বিশ্বের অনেক বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী, ধর্মতত্ত্ববিদ এবং সংস্কৃতি তাত্ত্বিকদের মধ্যে এই নৈতিক বিকাশ হয়ে উঠেছে আলোচনার একটি মুখ্য বিষয়। 

১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে এই বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে অধ্যয়নের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

সবার আগে জানা যাক, নৈতিকতা কি ?

নৈতিকতা কি ?

নৈতিকতা মূলত হল এক ধরণের আপেক্ষিক ধারণা, যা অনেকটাই বিমূর্ত। 

তা সত্ত্বেও, এই নৈতিকতা হল মানুষের নিজের সমাজে প্রচলিত নিয়মনীতি ও আচরণবিধি মেনে চলার প্রবণতা। 

এই নৈতিকতার নিয়মাবলীতে সমাজের প্রতিটা মানুষের ন্যায়-অন্যায়, ভালো-খারাপ, সততা-অসততা সরাসরি জড়িত থাকে। 

তবে, প্রতিটা সমাজের নৈতিকতা অন্য সমাজের থেকে আলাদা হতেই পারে।

কোহেলবার্গের নৈতিক তত্ত্ব:

কোহেলবার্গের নৈতিক বিকাশের তত্ত্ব হল এমন একটি তত্ত্ব যা শিশুদের মধ্যে কীভাবে নৈতিকতা এবং নৈতিক যুক্তি বিকশিত হয় সেই সম্বন্ধে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। 

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোহেলবার্গ নৈতিক বিকাশকে ছয়টি পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন। 

আর, এই তত্ত্বটিতে বলা হয়েছে, যে নৈতিক যুক্তি প্রাথমিকভাবে ন্যায়বিচার খোঁজা ও বজায় রাখার উপর নির্ভর করে চলে।

আমেরিকান এই মনোবিজ্ঞানী লরেন্স কোহেলবার্গ সবচেয়ে পরিচিত নৈতিক বিকাশের তত্ত্বগুলোর মধ্যে তাঁর এই সেরা তত্ত্বটি তৈরি করেছেন৷ 

তিনি পিয়াজেঁর পূর্ববর্তী তত্ত্বের উপর কিছু পরিবর্তন সাধন করে শিশুরা কীভাবে নৈতিক যুক্তির বিকাশ ঘটায় তার উপর আলোকপাত করেছেন।

কোহেলবার্গ তাঁর মোরাল ডেভেলপমেন্ট তত্ত্বে তিনটি প্রাথমিক স্তরের কথা উল্লেখ করেন। 

আর, এই প্রতিটা স্তরের ক্ষেত্রে তিনি দুটো করে ভাগের করা বলেছেন। 

পিয়াজেঁর বিশ্বাস অনুযায়ী, সমস্ত মানুষ জ্ঞানীয় বিকাশের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায় না। 

কোহেলবার্গও এই একই কথায় বিশ্বাস করে বলেছেন, যে সব ব্যক্তি নৈতিক বিকাশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অগ্রসর হতে পারে না।

স্তর ১: প্রাক-প্রচলিত নৈতিকতা (Pre-Conventional Morality)

প্রাক-প্রচলিত নৈতিকতা হল নৈতিক বিকাশের একদম প্রথম স্তর। 

এখন এই স্তরটি মানুষের প্রায় ৯ বছর বয়স পর্যন্ত থাকে। 

এই বয়সে শিশুদের সিদ্ধান্তগুলো প্রাথমিকভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রত্যাশা এবং নিয়ম ভঙ্গের পরিণতিগুলোর দ্বারা নির্ধারিত হয়। 

এই স্তরের মধ্যে দুটি ধাপ আছে-

ধাপ:১- (আনুগত্য ও শাস্তি):

নৈতিক বিকাশের আনুগত্য এবং শাস্তির প্রাথমিক স্তরগুলো মূলত ছোট শিশুদের মধ্যে ঘটে চলা সাধারণ একটা ব্যাপার। 

তবে, প্রাপ্তবয়স্করাও এই ধরণের ধারণাগুলো মেনে চলতে পারে। 

কোহেলবার্গের মতে, এই ধাপে ব্যক্তিরা নিয়মগুলোকে স্থির ও চরম নির্দেশিকা হিসাবে দেখে থাকে। 

নিয়ম পালন করে চলা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এই উপায়ে শাস্তি এড়ানো সম্ভব হয় বলে।

ধাপ:২- (ব্যক্তিত্ববাদ ও বিনিময়):

নৈতিক বিকাশের ব্যক্তিত্ববাদ এবং বিনিময় ধাপটি যেকোনো শিশুর মধ্যে পৃথক দৃষ্টিভঙ্গির তৈরির জন্য দায়ী। 

তারা এই ধাপে নিজেদের ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণ করে, আর এই চাহিদার উপর ভিত্তি করে তারা তাদের ক্রিয়াকলাপের বিচার করে। 

এই সময়ে নৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে পারস্পরিকতা সম্ভব হয় যদি এটি কেবলমাত্র তাদের নিজেদের স্বার্থ পূরণ করে চলে তো।

স্তর ২: প্রচলিত নৈতিকতা (Conventional Morality):

নৈতিক বিকাশের পরবর্তী স্তরটিতে সামাজিক নিয়মের দ্বারা নির্ধারিত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সঠিক ও নৈতিক ব্যাপারগুলোকে চিহ্নিত করা হয়।

এই পর্যায়ে, কিশোর-কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্করা তাদের আদর্শ ও সমাজ থেকে নেওয়া নৈতিক মানগুলো শিখে আত্মস্থ করে। 

এই সময়টিতে কর্তৃত্ব স্বীকার ও গ্রুপের নিয়ম মেনে চলার উপরও দৃষ্টি রাখা হয়। 

নৈতিকতার এই স্তরে দুটি ধাপ রয়েছে-

ধাপ:৩- (ভালো পারস্পরিক/ইন্টারপার্সোনাল সম্পর্ক তৈরী করা):

নৈতিক বিকাশের ভালো পারস্পরিক সম্পর্ক গঠনের এই স্তরটিতে সামাজিক প্রত্যাশা এবং ভূমিকা পালনের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে “ভাল ছেলে-ভাল মেয়ে” ব্যাপারটিকে তৈরী করা হয়। 

এখানে সামঞ্জস্যের উপর জোর দেওয়া হয়, যেখানে “ভালো হওয়া” এবং কীভাবে একই ধরণের পছন্দগুলো সবার মধ্যেকার সম্পর্ককে প্রভাবিত করে তার বিবেচনা করা হয়।

ধাপ: ৪- (সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা):

এই ধাপে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা নিশ্চিত করার উপর নজর দেওয়া হয়। 

নৈতিক বিকাশের এই ধাপে কোনো ব্যক্তি বিচার করার সময় সমগ্র সমাজের উপর ভিত্তি করে বিবেচনা করতে শুরু করে। 

নিয়ম মেনে চলে, নিজের কর্তব্য পালন করে ও সামগ্রিক কর্তৃত্বকে সম্মান করে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দেয়।

স্তর ৩: প্রথাগত নৈতিকতা (Postconventional Morality):

নৈতিক বিকাশের এই স্তরে মানুষেরা নৈতিকতার বিমূর্ত নীতিগুলো বোঝার চেষ্টা করে। 

এই স্তরের দুটি ধাপ রয়েছে-

ধাপ: ৫- (সামাজিক চুক্তি এবং ব্যক্তিগত অধিকার):

একটি সামাজিক চুক্তি এবং ব্যক্তিগত অধিকারের ধারণাগুলো পরবর্তী পর্যায়ে প্রত্যেকের মনে আলাদা মূল্যবোধ, মতামত এবং অন্যান্য মানুষের বিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করতে শুরু করে। 

আইনের নিয়মগুলো একটি সমাজকে বজায় রাখার জন্য একান্তই গুরুত্বপূর্ণ। 

কিন্তু, সেক্ষেত্রে সমাজের সদস্যদের নির্দিষ্ট করা মানগুলোর সাথে একমত হওয়াও একান্ত জরুরি।

ধাপ: ৬- (সর্বজনীন নীতি):

কোহলবার্গের নৈতিক যুক্তির শেষ ধাপটি হল সর্বজনীন নৈতিক নীতি এবং বিমূর্ত যুক্তির উপর গড়ে তোলা নিয়মকানুন। 

এই ধাপে প্রতিটি ব্যক্তি আইন ও নিয়মের সাথে তার মতবিরোধ থাকলেও ন্যায়বিচারের অভ্যন্তরীণ নীতিগুলো সে অনুসরণ করেই চলে। 

কোহেলবার্গের মত অনুযায়ী, শুধুমাত্র অল্প শতাংশ ব্যক্তিই (প্রায় ১০-১৫%) এই প্রথাগত পর্যায়গুলোতে পৌঁছোতে পারে। 

একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, প্রথম চারটি ধাপ বিশ্বব্যাপী সর্বজনীন জনসংখ্যার ক্ষেত্রে মেনে চলার প্রবণতা দেখা গেলেও, এই পঞ্চম এবং ষষ্ঠ ধাপগুলো বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে অত্যন্ত কম মানুষই মেনে চলে।

নৈতিক বিকাশের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব:

সমাজে নৈতিক বিকাশের বেশ কয়েকটি প্রয়োজনীয়তা আছে –

১. ভালো-খারাপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া:

এই নৈতিক বিকাশ মানুষের মধ্যে ভালো-খারাপ, ন্যায়-অন্যায়, সততা-অসততা, অপরাধ সম্পর্কে একটা স্পষ্ট মতামত তৈরিতে সাহায্য করে, যা পরবর্তীতে তাদের মধ্যে জীবন ও সমাজ সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে যথেষ্ট সাহায্য করে থাকে।

২. গণতান্ত্রিক গুণ নির্মাণে সাহায্য করে:

নৈতিক বিকাশ মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক গুণ, যেমন- প্রতি ব্যক্তিকে মর্যাদা প্রদান, সামাজিক বিচার, মর্যাদা, স্বাধীনতাবোধ তৈরিতে সাহায্য করে।

যা দেশ গঠনের জন্যে খুবই প্রয়োজনীয়।

৩. সমাজের ভুলগুলো শুধরোতে সাহায্য করে:

নৈতিক বিকাশের মাধ্যমে মানুষ সমাজের ভুলগুলো সম্পর্কে প্রতিবাদ করতে শেখে, আর সামাজিক অবিচারগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।

৪. বেঁচে থাকার জন্যে নৈতিকতা থাকা বাঞ্চনীয়:

সমাজে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাস করতে হয়, সেক্ষেত্রে নৈতিকতা শিখে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ও সামাজিক ব্যবহারবিধি মেনে চলা একান্ত জরুরি। 

তাই, শক্তিশালী নৈতিক বিকাশ মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে বাঞ্চনীয়।

এইসব কারণের জন্যে আমাদের শিশু বয়স থেকে যে নৈতিকতা শেখানো হয়, তা ভবিষ্যতে আমাদের সমাজ ও দেশের উন্নতিতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করে। 

অর্থাৎ, নৈতিকতার শিক্ষাতে যেসব সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখানো হয় তা দেশ ও দশের ভবিষৎকে সুরক্ষিত করে তুলতে সাহায্য করে।

এখন জানা যাক,

শিশুদের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে নৈতিক আচরণ প্রভাবিত হয় ?

শিশুদের বড় হয়ে ওঠার বিভিন্ন স্তরে তাদের নৈতিক আচরণ নানান বিষয়ের উপর নির্ভর করতে পারে। 

যথা- ৪-১০ বছরের বাচ্চাদের নৈতিক আচরণ অভিভাবকদের অনুশাসনের উপরই নির্ভর করে। 

আবার, ১০-১৩ বছরের শিশুদের নৈতিক আচরণ সমাজে প্রচলিত ভালো-খারাপ আচার-বিচারের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। 

অন্যদিকে, ১৩ বছরের অধিক শিশুদের নৈতিক আচরণ নির্ভর করে তাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, বিবেক ও বুদ্ধির উপর। 

আমাদের আজকের নৈতিক বিকাশ নিয়ে লেখাটি এখানেই শেষ হল।

লেখাটি ভালো লাগলে অবশ্যই সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করবেন এবং কোনো প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকলে কমেন্ট করে জানাবেন।

 

About The Author

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top